মাওলানা

শামছুদ্দীন কাসেমী

মাওলানা শামছুদ্দীন কাসেমী ছিলেন ঢাকায় কওমি মাদরাসা শিক্ষা প্রচারের অন্যতম পথিকৃৎ এবং ইসলামী রাজনীতির অন্যতম ব্যক্তিত্ব।

জন্ম ও বংশ

মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা শামছুদ্দীন কাসেমী রহ.-এর পিতার নাম মৌলভী মুহাম্মদ মুদ্দাসের, মাতার নাম উম্মে হাবীবা। তিনি ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের সন্দ্বীপের অন্যতম সংগ্রামী পুরুষ মরহুম আলী মুন্সীর বংশধর। মরহুম আলী মুন্সী তৎকালে ফার্সী ভাষার একজন সুপণ্ডিত উকিল ছিলেন। জমিদারদের অত্যাচার ও বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্দোলনে তাঁর পূর্বপুরুষদের ভূমিকা ও অবদান অবিস্মরণীয়। বাদশাহ আলমগীর আওরঙ্গজেবের সাথে তার ভাই সুজা লড়াইয়ে পরাজিত হলে চট্টগ্রামে এসে আশ্রয় নেন। সে সময় মাওলানা কাসেমী রহ.-এর পূর্বপুরুষরা চট্টগ্রামে আসেন এবং স্থায়ীভাবে সন্দ্বীপে বসবাস করতে থাকেন।

শিক্ষা-দীক্ষা

গ্রামের মক্তব ও প্রাথমিক স্কুলে তিনি শিক্ষাজীবনের সূচনা করেন। স্কুলে বৃত্তি পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অর্জন করেন। পিতা তার অসাধারণ মেধা অনুভব করে আলেম বানানোর উদ্দেশে পার্শ্ববর্তী রিয়াজুল উলূম মাদরাসায় ভর্তি করে দেন। সেখানে বছর কয়েক সুনাম ও দক্ষতার সাথে পড়াশোনা করেন। তারপর মাওলানা মুহাম্মদ মূসার পরামর্শে তিনি সন্দ্বীপ হরিশপুর বশীরিয়া আহমদিয়া সিনিয়র মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে থেকে তিনি দাখিল, আলিম ও ফাযিল পাশ করেন।
১৯৫৫ সালে তিনি দারুল উলূম দেওবন্দ ভর্তি হন। সেখানে অত্যন্ত পরিশ্রম ও দক্ষতার সাথে ফিকহ, মানতেক ও অন্যান্য উচ্চতর শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। দু'বছর পর শারিরীক অসুস্থতার কারণে তিনি দেশে ফিরে আল জামিয়াতুল আরাবিয়াতুল ইসলামিয়া জিরি মাদরাসায় কিছুকাল পড়াশোনা করেন।

১৯৫৮ সালে তিনি উচ্চতর পড়াশোনার উদ্দেশ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরে ভর্তি হন। সেখানে দাওরায়ে হাদীস ও উচ্চতর তাফসীর শিক্ষা সমাপ্ত করেন।

১৯৬০-৬১ সালে তিনি আহমদ আলী লাহোরী রহ.-এর তাফসীরের দরসে অংশগ্রহণ করে বিশেষ সনদ লাভ করেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য শিক্ষক
তার উস্তাদগণের মধ্যে রয়েছেন আল্লামা আহমদ আলী লাহোরী, আল্লামা ইদরীস কান্ধলভি, মুফতী রসূল খান, মাওলানা জামিল আহমদ থানবী, শায়খুল হাদীস নাসির আহমদ খান, মাওলানা আহমদ হাসান বিহারী, মাওলানা মিয়া আখতার হুসাইন ও মাওলানা ফয়েজ আলী শাহ রহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ।

কর্মজীবন

১৯৬১ সালে তিনি মোমেনশাহী জেলার ঐতিহ্যবাহী দারুস সালাম সোহাগি মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে এক বছর অধ্যাপনা করে ১৯৬২ সনে ঢাকার জামিয়া হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম বড় কাটারা মাদরাসায় দুই বছর শীর্ষ মুহাদ্দিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর ১৯৬৪ সালে জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ মাদরাসায় মুহাদ্দিস হয়ে যোগদান করেন। এখানে তিনি দীর্ঘ ৬ বছর সদরুল মুদাররিস হিসেবে পাঠদান করেন। এ সময় সাভার জামিয়াতুল মাদানিয়া রাজফুলবাড়িয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে কিছুকাল মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ১৯৬৯ সালে জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ি মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং এক বছর কাল অবৈতনিকভাবে উস্তাযুল হাদীস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭০ সালে তার পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকার বুকে প্রতিষ্ঠা লাভ করে 'জামিয়া হুসাইনিয়া আরজাবাদ মাদরাসা'। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় দুর্বৃত্তরা মাদরাসাটি জ্বালিয়ে ভস্ম করে দেয়। ফলে তিনি ঢাকা ছেড়ে নিজ বাড়ি সন্দ্বীপ চলে যান।

'৭১-এর যুদ্ধের পর তিনি জামিয়া মাদানিয়া চট্টগ্রামের মুহতামিম এবং দামপাড়া বায়তুল আযীয মসজিদের ইমাম ও খতীব হিসেবে কিছুকাল দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫ সালে শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরামের পরামর্শে ঢাকার মিরপুরে 'জামিয়া হুসাইনিয়া আরজাবাদ' মাদরাসায় প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭৬ সালে সেখানে মুহতামিমের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৬ থেকে থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত আমৃত্যু প্রধান মুহাদ্দিস ও মুহতামিম হিসেবে দক্ষতা, সুনাম ও নিপুণতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

অবদান

তারই আহ্বানে কওমি মাদরাসা সংগঠন ঐতিহ্যবাহী 'বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ' গঠিত হয়।
রাজনীতি: তিনি একাধিকবার জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব নির্বাচিত হন। ১৯৬৬ সালের ১৬ই মার্চ ঢাকার নবাব বাড়ির আহসান মঞ্জিলের দ্বিতীয় তলায় জমিয়তে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিতে হলে তিনি জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন।

১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সেক্রেটারি থাকাকালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে আল্লামা গোলাম গাওস হাজারভী, মুফতী মাহমুদ ও পীর মুহসিন উদ্দীন দুদু মিয়া রহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখের সঙ্গে ব্যাপক সফর করেন। বিভিন্ন সভা-সেমিনারে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বক্তৃতা প্রদান করেন।

১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৭ সালে পুনরায় জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৮০ সালে ঢাকা লালকুঠি হলে অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে তিনি মহাসচিব নির্বাচিত হন।

অবশেষে ১৯৯৪ সালে তিনি নির্বাহী সভাপতি নির্বাচিত হন। আমৃত্যু তিনি এ গুরুদায়িত্ব পালন করে যান। হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর প্রথম নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি এবং ইসলামী ঐক্যজোটের প্রতিষ্ঠাতা সমন্বয়কদের অন্যতম ছিলেন।
বাতিলের মোকাবিলা: আল্লামা শামসুদ্দীন কাসেমী রহ. বাতিলের মোকাবিলায়

সদা সোচ্চার ছিলেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে খ্রিষ্টান মিশনারির অপতৎপরতার বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি 'দেশ ও ঈমান বাঁচাও' আন্দোলনের ডাক দেন। শিয়া ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে তিনি জাতির নিকট ইসলামের সঠিক বক্তব্য তুলে ধরতে প্রয়াসী হন।

কাদিয়ানি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তিনি সর্বদা কঠোর ছিলেন। তাদেরকে কাফের ঘোষণা ও তাদের বিকৃত তাফসীর প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য আন্দোলন করেন। তাদের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে গ্রন্থ রচনা করে জাতিকে সঠিক দিশা দানে ভূমিকা রাখেন।
সাহিত্যকর্ম: সাপ্তাহিক জমিয়ত, মাসিক পয়গামে হক, বাইতুল মোকাদ্দাস ও মসজিদে আকসা, খ্রিষ্টান মিশনারীদের উৎপাত, রমজানের সওগাত, ইসলাম বনাম কমিউনিজম, ধর্মনিরপেক্ষতা, শিয়া কাফের ও কাদিয়ানী ধর্মমত।

আধ্যাত্মিকতা

তিনি শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর নিকট বায়আত হয়ে আধ্যাত্মিক দীক্ষা লাভ করেন।

ব্যক্তিচরিত্র ও আখলাক

তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী মাসিক মদীনার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমীর সাথে আমার পরিচয়ের পরিধি প্রায় তিন যুগের। লাহোর থেকে তিনি শুধু হাদিসের সনদ নিয়ে আসেননি। শায়খুত তফসির মাওলানা আহমদ আলী লাহোরী (রহ.)-এর নিকট থেকে একাধারে পবিত্র কোরআনের অত্যাধুনিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহ (রহ.) ঘরানার চিন্তা-চেতনা নিয়ে ও দেশে ফিরেছিলেন, ফলে দেশে ফিরেই তিনি যখন অনুরূপ চিন্তা-চেতনার সঙ্গী-সাথীর অনুসন্ধান করেন তখন কোন এক অদৃশ্য আকর্ষণে যেন আমরা একাত্ম হয়ে গেলাম!’

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. আরও বলেন, ‘১৯৬২ সালের ১ বৈশাখ ঢাকার পূর্বাঞ্চলে যে প্রলয়ঙ্করী টর্নেডো হয়েছিল সেই টর্নেডো বিধ্বস্ত জনপদগুলোতে আমরা গিয়েছিলাম কিছু চিড়া-গুড় নিয়ে। দলনেতা ছিলাম আমি ( মাওলানা খান), কাসেমী সাহেব সহকারী। দলে ছিলাম ছয় জন। প্রত্যেকেরই মাথায় একটি চিড়ার বস্তা, কাঁধে ঝুলানো গুড় ভর্তি থলে। পায়ে হাঁটা গ্রামের পথে এই বোঝা বয়ে আমরা সকাল দশটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত ঘুরেছিলাম। ফেরার পথে ক্ষুধায় ক্লান্তিতে পা চলছিল না। কাসেমী সাহেব তখন দলের সবাইকে এই বলে উৎসাহিত করেছিলেন যে, যাওয়ার সময় তো প্রত্যেকের মাথায় ছিল এক মণ করে চিড়ার বস্তা এবং কাঁধে ছিল দশ সের করে গুড়। এখন তো খালি হাত পা। চলতে থাকুন!'

ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার

পারিবারিক জীবনে তিনি ৫ ছেলে ও ৩ মেয়ের জনক ছিলেন।

মৃত্যু

আল্লামা শামসুদ্দীন কাসেমী রহ. ১৯৯৬ সালের ১৯ শে অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি, খলীফায়ে মাদানী হাফেয আব্দুল করীম শায়খে কৌড়িয়া রহ.-এর ইমামতিতে তার জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয়। তাকে মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়।

প্রতিষ্ঠান

তথ্যসূত্র

  1. মাসিক পয়গামে হক আল্লামা শামছুদ্দীন কাসেমী সংখ্যা

শেষ হালনাগাদ: ১ নভেম্বর, ২০২৬

একই জেলার আরও আলেম

একই শতাব্দীর আলেম