খতিবে মিল্লাত মাওলানা

উবায়দুল হক

খতিব মাওলানা উবায়দুল হক জালালাবাদী রহ. ছিলেন সর্বজনবিদিত একজন আলেম ও দাঈ।

জন্ম ও বংশ

খতিব মাওলানা উবায়দুল হক জালালাবাদীর পিতা মাওলানা জহুরুল হক, দাদা মুনশী উমীদ রেযা এবং পরদাদা আদেল রেযা।
তাঁর পিতা হযরত মাওলানা জহুরুল হক হিজরী ১৩৩৫ সনে দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দাওরায়ে হাদীস পাশ করেন। তিনি হযরত আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরীর শাগরিদ এবং মাওলানা ইদরীস কান্দলবীর সহপাঠী ছিলেন। মাওলানা জহুরুল হক পড়াশোনা সমাপ্ত করে হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা শাহ আশরাফ আলী থানবী (র)-এর সঙ্গে ইসলাহী সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং হিজরী ১৩৩৬ সনে হযরত থানবীর পক্ষ থেকে খেলাফত ও বায়আতের ইজাযতপ্রাপ্ত হন।

জন্ম
হযরত মাওলানা উবায়দুল হক সিলেট জেলার জকিগঞ্জ থানাধীন বারোঠাকুরী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম তারিখ ১৩৩৫ বাংলার ১৪ বৈশাখ জুমআবার মোতাবেক ১৯২৮ সনের ২ মে।

শৈশব

প্রাথমিক পড়ালেখা ঘরোয়া পরিবেশে পিতার নিকট অর্জন করেন। এর পর তিনি সিলেটের বিয়ানী বাজার থানার অন্তর্গত ঘুঙ্গাদিয়া গ্রামে অবস্থিত মাদরাসায় গমন করে হযরত মাওলানা শামসুল হক শাহবাগীর নিকট কারীমা পান্দেনামা ইত্যাদি কিতাব পাঠ করেন। মাওলানা উবায়দুল হক এ মাদরাসায় দুই বছর পড়েন। হাকীমুল উম্মত হযরত থানবী (র)-এর খলীফা হযরত মাওলানা আতহার আলী এ মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর দুই বছর হবিগঞ্জের মাওলানা মুদ্দাসসির আহমদ ও মাওলানা মুসীর আলীর নিকট বিভিন্ন বিষয়ের কিতাব পড়েন। তাঁরা উভয়ে ছিলেন দেওবন্দ থেকে উত্তীর্ণ বিশিষ্ট আলেম।

শিক্ষা-দীক্ষা

অতঃপর তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত মুনশী বাজারের সন্নিকটে অবস্থিত আয়ারগাঁও মাদরাসায় কিছুকাল পড়াশুনা করেন। সর্বশেষে তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশে বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র চৌদ্দ বছর। তিনি সেখানে ১৩৬২ হিজরী মোতাবেক ১৯৪২ সালে কাফিয়া জামাআতে ভর্তি হন। হিজরী ১৩৬৪ সনে তাঁর পিতার ইনতিকাল হয়। পিতার অসুস্থতার সংবাদ শুনে তিনি বাড়ী আসেন। এর আনুমানিক দশ বার দিন পর তাঁর পিতার ইনতিকাল হয়। ইনতিকালের পর এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি পুনরায় দেওবন্দ তশরীফ নিয়ে যান। সে সময় তাঁর বাড়ী থেকে দেওবন্দ পৌছার ভাড়া ছিল মাত্র বিয়াল্লিশ টাকা।

হযরত মাওলানা উবায়দুল হক হিজরী ১৩৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে দাওরায়ে হাদীস, ৬৭-৬৮ শিক্ষাবর্ষে দাওরায়ে তাফসীর এবং ৬৮-৬৯ শিক্ষাবর্ষে ফন্‌নাতের কিতাব- হেদায়া আখেরাইন, কাযী মুবারক, সদরা, তাসরীহ, উকলীদাস ও তাওযীহ ইত্যাদি কিতাব পড়েন এবং খোশখতের মশক করেন।

কর্মজীবন

তিনি ১৯৫১ সনে ঢাকার আশরাফুল উলুম বড়কাটরা মাদরাসায় হাদিসের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। এরপর ১৯৫৩ সনে পাকিস্তানের দারুল উলুম করাচিতে মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে আবু দাউদ শরীফ ও হেদায়া আখেরাইন ইত্যাদি কিতাবের পাঠদান করেন।
অতঃপর হাকীমুল উম্মত হযরত থানবীর খলীফা এবং পাকিস্তান নেজামে ইসলাম পার্টির শীর্ষ নেতা হযরত মাওলানা আতহার আলী মুফতী শফী সাহেবের অনুমতিক্রমে মাওলানা উবায়দুল হককে ঢাকায় নিয়ে আসেন। মাওলানা আতহার আলী সাহেবের ইচ্ছা ছিল, নেজামে ইসলাম পার্টির রচনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব মাওলানা উবায়দুল হকের উপর সোপর্দ করা। তবে এর অল্পদিন পরই কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার ভেঙ্গে দেয় এবং সকল রাজনৈতিক দল বেআইনী ঘোষণা দিয়ে যাবতীয় কার্যকলাপ বন্ধ করে দেয়। যার ফলে নেজামে ইসলাম পার্টির সকল তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়।

এ সময় মাদরাসা-ই আলীয়া ঢাকায় সিনিয়র শিক্ষকের একটি পদ খালি হয়। তাঁকে এ পদে যোগদানের জন্য নিমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি তাঁর শায়খ ও উস্তাদ শায়খুল আরব ওয়াল আজম হযরত মাওলানা সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানীর অনুমতি নিয়ে মাদরাসা-ই আলীয়া ঢাকায় যোগদান করেন।

তিনি ১৯৫৪ সন থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত সহকারী শিক্ষক, ১৯৬৪ সন থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত হাদীস বিভাগে লেকচারার, ১৯৭১ থেকে ১৯৭৩ পর্যন্ত তাফসীর বিভাগে এসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, ১৯৭৩ থেকে '৭৯ পর্যন্ত এডিশনাল হেড মাওলানা এবং ১৯৮০ থেকে ২ মে ১৯৮৫ সন পর্যন্ত হেড মাওলানা পদে অধিষ্ঠিত থেকে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন। ১৯৮৪ সালে তিনি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব হিসেবে নিযুক্ত হন।

অবদান

মাদরাসা-ই আলীয়া ঢাকায় চাকরি করাকালে দেশের কওমী মাদরাসাসমূহের সঙ্গেও তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। ঢাকা আলীয়া মাদরাসা থেকে অবসর গ্রহণের পর কয়েক বছর তিনি ঢাকার ইসলামপুর ইসলামিয়া মাদরাসায় মুহতামিমের দায়িত্ব সম্পাদন করেন এবং ১৯৮৫ থেকে মৃত্যু অবধি ঢাকার মাদরাসা ফয়জুল উলুমের শায়খুল হাদীস ও মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি জামেয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জের মজলিসে শূরার সভাপতি, কুমিল্লা কাসিমুল উলুম মাদরাসার মজলিসে শূরার সভাপতি এবং হাটহাজারী মাদরাসা, পটিয়া মাদরাসা ও সিলেট দরগাহ মাদরাসাসহ আরো অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মজলিসে শূরার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৮৪ সাল থেকে বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমের সম্মানিত খতীব হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।


রচনা ও ইলমী খেদমত

এ যাবৎ তাঁর অনেকগুলো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি: তারীখে ইসলাম (দুই খণ্ড), সীরাতে মুস্তফা, তাসহীলুল কাফিয়া, আযহারুল আযহার শরহে নূরুল আনওয়ার, নশরুল ফাওয়ায়েদ, খোলাসায়ে শরহুল আকায়েদ, আস সেকায়া আলা শরহিল বেকায়া, শীআ সুন্নী এখতেলাফ, শরহে শিকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়া, কুরআন বুঝিবার পথ, কুরআনে হাকীম আওর হামারী যিন্দেগী ইত্যাদি।

আধ্যাত্মিকতা

তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে দাওরায়ে তাফসীরে পড়াকালে শায়খুল ইসলাম কুতবুল আলম হযরত মাওলানা সাইয়েদ হোসাইন আহমদ মাদানীর হাতে বায়আত হন। তাঁর ওফাতের পর হাকীমুল উম্মত হযরত থানবীর খলীফা হযরত হাফেজ্জী হুযুর থেকে ফয়েয হাসিল করতে থাকেন।

হযরত হাফেজ্জী হুযুরের ইনতিকালের পর মাওলানা উবায়দুল হক সাহেব হযরত থানবীর কনিষ্ঠ খলীফা মাওলানা আবরারুল হক সাহেবের সঙ্গে এসলাহী সম্পর্ক স্থাপন করেন।

ব্যক্তিচরিত্র ও আখলাক

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমের সম্মানিত খতীব মরহুম হযরত মাওলানা উবায়দুল হক ছিলেন অতি উচ্চ পর্যায়ের ভাল মানুষ। সমাজের লক্ষ লক্ষ মানুষের মাঝেও তাঁর তুল্য মহৎপ্রাণ ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সকলের অনুসরণ করার মত অনেক মানবিক গুণ তাঁর চরিত্রে বিদ্যমান ছিল। পানাহার ও পোশাক পরিচ্ছদ গ্রহণে তিনি একজন রুচিশীল মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন অতিথিপরায়ণ। সকাল থেকে রাত দশটা পর্যন্ত তাঁর ঘরে একজনের পর একজন মেহমান আসতেই থাকত। তিনি কমপক্ষে চা বিস্কুট না খাইয়ে কোন মেহমানকে বিদায় দিতেন না। খাওয়া দাওয়ার সময় তিনি মেহমানদেরকে নিয়েই আহার করতেন। হযরত মাওলানা উবায়দুল হক সব সময় আত্মীয়-স্বজন ও আপনজনদের দুঃখ-দুর্দশায় পাশে এসে দাঁড়াতেন। যে কোন দরিদ্র ও বিপদগ্রস্ত মানুষ আর্থিক ও সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য তাঁর নিকট আগমন করলে তিনি সাধ্যপরিমাণ তার প্রতি সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করতেন। তিনি তাঁর জন্মস্থান বারোঠাকুরী গ্রামে বসবাসরত তাঁর দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানে অসাধারণ খেদমত আঞ্জাম দিতেন।
হযরত মাওলানা উবায়দুল হক সাহেব মাদরাসার

ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার

হযরত মাওলানা উবায়দুল হক সব সময় আত্মীয়-স্বজন ও আপনজনদের দুঃখ দুর্দশায় পাশে এসে দাঁড়াতেন। যে কোন অভাবী ও বিপদগ্রস্ত মানুষ আর্থিক ও সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য তাঁর নিকট আগমন করলে তিনি সাধ্যপরিমাণ তার প্রতি সহযোগিতার হস্ত প্রসারিত করতেন। তিনি তাঁর জন্মস্থান বারোঠাকুরী গ্রামে বসবাসরত তাঁর দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানে অসাধারণ খেদমত আঞ্জাম দেন।

মৃত্যু

তিনি বিগত চৌদ্দশ আটাশ হিজরীর চব্বিশে রমযানুল মুবারক (মোতাবেক ৬ অক্টোবর'০৭) শনিবার আজিমপুরের নিজ বাসভবনেই ইফতার করেন। ধানমন্ডির তাঁর এক ঘনিষ্ঠজনের বাসায় রাতের খাবারের দাওয়াত ছিল। তিনি সেখানে খাওয়া দাওয়া করেন। বাসায় ফেরার সময় হঠাৎ করে তিনি গাড়িতে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। রাত আনুমানিক পৌনে এগারটায় গ্রীন রোডের ল্যাব এইড ক্লিনিকে তাঁকে নেওয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসকদের ধারণা মতে, তিনি পথেই পরম প্রিয়তম মহান প্রভুর নিবিড় সান্নিধ্যে চলে যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। পরদিন বেলা তিনটায় জাতীয় ঈদগাহে তাঁর সালাতে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় ইমামতি করেন তাঁর দ্বিতীয় পুত্র আলহাজ হযরত মাওলানা আতাউল হক। এরপর আজিমপুর কবরস্তানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

প্রতিষ্ঠান

রচনাবলি

  • তারীখে ইসলাম (দুই খণ্ড) (বাংলা) (প্রকাশিত)
  • সীরাতে মুস্তফা (বাংলা) (প্রকাশিত)
  • তাসহীলুল কাফিয়া (উরদু) (প্রকাশিত)
  • আযহারুল আযহার শরহে নূরুল আনওয়ার (উরদু) (প্রকাশিত)
  • নশরুল ফাওয়ায়েদ (উরদু) (প্রকাশিত)
  • খোলাসায়ে শরহুল আকায়েদ (উরদু) (প্রকাশিত)
  • আস সেকায়া আলা শরহিল বেকায়া (উরদু) (প্রকাশিত)
  • শীআ সুন্নী এখতেলাফ (বাংলা) (প্রকাশিত)
  • শরহে শিকওয়া ও জওয়াবে শিকওয়া (উরদু) (প্রকাশিত)
  • কুরআন বুঝিবার পথ (বাংলা) (প্রকাশিত)
  • কুরআনে হাকীম আওর হামারী যিন্দেগী (উরদু) (প্রকাশিত)

তথ্যসূত্র

  1. মাদরাসা ফয়জুল উলুম আজিমপুর থেকে মাওলানা জুবাইর আহমদ আশরাফ সম্পাদিত গ্রুন্থ 'আকাশছোঁয়া মিনার' থেকে সংকলন করা হয়েছে।

শেষ হালনাগাদ: ১ নভেম্বর, ২০২৬

একই শতাব্দীর আলেম