আব্দুল ওয়াহেদ বাঙ্গালি রহ. বাংলাদেশে ইসলামের প্রবেশদ্বার চট্রগ্রামের বোয়ালখালি থানাধীন খরন্দ্বীপ গ্রামে আনুমানিক ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে ১২৫৬ বাংলার এক শুভমুহূর্তে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জনাব জিন্নাত আলি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এবং অভিজাত পরিবারের লোক ছিলেন।
মাওলানা
আব্দুল ওয়াহেদ বাঙ্গালি (রহ.)
আব্দুল ওয়াহেদ বাঙ্গালি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম দেওবন্দী ধারার মাদরাসা—জামিয়া ইসলামিয়া মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম একজন।
জন্ম ও বংশ
শৈশব
তাঁর পিতা তদানীন্তন রাঙ্গুনিয়া থানার কাওখালি মুন্সিফ আদালতের একজন খ্যাতনামা মুন্সেফ ছিলেন বলে এক সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে তিনি লালিত-পালিত হন। প্রাথমিক শিক্ষা সুদক্ষ পিতার সাহচর্যে সম্পন্ন করেন। অত্যন্ত মনোযোগী, মেধাবী ও কর্মঠ ছিলেন বিধায় পিতার নিকট থেকে প্রাথমিক শিক্ষার্জনের পর স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। প্রতি বৎসর কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে ৮ম শ্রেণিতে উপনীত হন এবং ঐ বৎসরই মনে বিশেষ ভাবের সঞ্চার হওয়ায় শিক্ষার গতির দিক পরিবর্তন করে দ্বীনি ইলম শিক্ষার প্রতি মনোনিবেশ করেন।
আল্লাহ তা’আলার রহমতের দৃষ্টি মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ ছাহেবের প্রতি তাঁকে একজন আলেমেদ্বীন ও হক্কানি বুযুর্গ হিসাবে গড়ে তোলার জন্য শৈশব থেকেই বর্ষিত হচ্ছিলো। আব্দুল জলিল, আব্দুল জব্বার ও আব্দুল ওয়াহেদ নামে পিতার তিন সন্তানের মধ্যে আব্দুল ওয়াহেদ ছাহেব ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। সব ছেলেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য মুন্সেফ ছাহেব আপ্রাণ চেষ্টা ও শাসন করেও বড় দু’ছেলেকে পড়ালেখায় মনোযোগী করতে ব্যর্থ হন।
আব্দুল ওয়াহেদ রহ. কৃতিত্বের সাথে ৮ম শ্রেণীতে পদার্পণ করেন, তখন ক্লাসপাঠ্য একটি উর্দূ কিতাবের কয়েকটি লাইন পাঠকালে তাঁর মনে বিশেষ ভাবের উদয় হয়।
অবশেষে তিনি কলকাতায় গমনপূর্বক পিতার এক বন্ধুর বাড়িতে অবস্থান করে এবং পিতার বন্ধুর নিকট মনের সব কথা খুলে বলেন। অতপর চট্টলার সরকার পরিচালিত তৎকালীন একমাত্র দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মুহসিনিয়া মাদরাসায় (বর্তমান হাজি মুহসিন কলেজ) ভর্তি করে দেন।
শিক্ষা-দীক্ষা
তিনি আরবি পড়ালেখা করছেন বিধায় অনেক আত্মীয়-স্বজন তাঁকে উপহাস ও হেয় প্রতিপন্ন করতে থাকে। অবশেষে তিনি বিরক্ত হয়ে পুনরায় সকলের অগোচরে ঐতিহাসিক দ্বীনি বিদ্যাপীঠ দারুল উলূম দেওবন্দ গমন করেন এবং এমনভাবে ইলমেদ্বীন হাছিল করার জন্য আত্মনিয়োগ করেন যে, আত্মীয়-স্বজন বা বাড়িঘর থেকে কোনো চিঠি-পত্র আসলে তা পড়তেন না, বরং তা একটি পাত্রে জমা করে রাখতেন। এভাবে দীর্ঘ ১৪টি বৎসর অধ্যয়ন করে অবশেষে দাওরায়ে হাদিছের (টাইটেল) সর্বশেষ পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন।
কর্মজীবন
চট্টগ্রামের তদানীন্তন আলেম মাওলানা হাবীবুল্লাহ, মাওলানা আবদুল হামিদ এবং অন্যান্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় যখন হাটহাজারী মাদরাসা সুন্দর ও সুচারুরূপে চলতে লাগলো, তখন এর নামযশ ও সুখ্যাতি শুনে চতুর্দিক থেকে বহু ছাত্র আসতে থাকে। ক্রমবর্ধমান ছাত্রের চাহিদা ও মাদরাসাটি কয়েক শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত হওয়ায় তাজবিদ বিভাগের শিক্ষক হিসাবে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ ছাহেবকে নিযুক্ত করা হয়। তিনিই ছিলেন হাটহাজারী মাদরাসার প্রথম কারি।
মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ ছাহেব নাজায়েয পন্থাবলম্বন না করে হালাল উপায়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য বংশীয় মর্যাদা এবং ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও স্বল্প পারিশ্রমিক নিয়ে এলাকার বড় বড় দীঘি ও পুকুরের কচুরীপানা পর্যন্ত পরিস্কার করতেন। শহরে এসেও মাওলানা ছাহেব একটি দোকান ঘর ভাড়া নিয়ে ভারতের লাখনৌ হতে টুপি রুমাল ইত্যাদি আমদানি করে বিক্রি করতেন এবং জনগণকে দ্বীন বুঝাতেন ও দাওয়াত দিতেন।
বিভিন্ন জায়গায় বিতর্ক সভায় সভার সময় হযরতের মধুর কন্ঠের কুরআন তিলাওয়াত ও আযান শুনে মানুষ অভিভুত হয়ে যেতো। আর তাঁর উজ্জ্বল ও ফর্সা চেহারা, সুন্দর-সবল দেহ, ধবধবে সাদা পোশাক পরিধান করার অভ্যাস এবং পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কারণে হযরতকে আরও গম্ভীর ও মর্যাদাবান মনে হতো। মানুষকে বুঝানোর সাবলীল ভাষা, ভঙ্গিমা ও ভাষাজ্ঞান সহজেই হৃদয়গ্রাহী হতো।
তাঁর এমন দক্ষতা ছিলো যে, বাংলায় যখন কথাবার্তা বলতেন, মনে হতো যেনো একজন ভাষাবিদ। ইংরেজিতে যখন কথা বলতেন, মনে হতো যেনো একজন ইংরেজ প্রফেসর। আরবি বলার সময় মনে হতো, তিনি একজন আরবভাষী। আর উর্দূতে আলাপ-আলোচনা শুনলে মনে হতো তিনি দিল্লির লোক।
অবদান
চট্রগ্রামে ইসলাম প্রচার-প্রসারে তাঁর অবদান অনন্য। তিনি মাওলানা হাবিবুল্লাহ কুরাইশি রহ., মাওলানা আবদুল হামিদ সাহেব রহ. ও মাওলানা সূফি আযিযুর রহমান সাহেবকে নিয়ে হাটহাজারী মাদরাসার ভিত্তি স্থাপন করেন। তিনি ছিলেন সবার আমির ও মুরব্বি। তিনিই মাওলানা হাবিবুল্লাহ সাহেবকে হাটহাজারী মাদরাসার মুহতামিম নিযুক্ত করেছিলেন। মাওলানা আবদুল হামিদ সাহেবের মুখ তেজস্বী ও চালু ছিলো বিধায় তাঁকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সুদক্ষ তর্কবিদ হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন। মোটকথা, আজ হাটহাজারী মাদরাসাসহ যে সকল দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, এর পেছনে তাঁর বিরাট অবদান রয়েছে।
আল্লাহ তা’আলার অভিপ্রায় ছিলো-তাঁর দ্বারা বাংলার যমিনে দ্বীনের প্রচার-প্রসার এবং ইসলামের মহান কাজ সম্পাদিত হওয়া,
যা কিয়ামত পর্যন্ত সদকায়ে জারিয়া হিসাবে চালু থাকবে। আর এটা হয়েছেও। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও মুজাহাদার কারণে অসংখ্য মানুষ দ্বীনের পথে ফিরে আসছে এবং দারুল উলূম হাটহাজারী মাদরাসাসহ বিভিন্ন স্থানে মসজিদ ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর মেহনতের সুফল হিসাবে আজ আমরা ঈমান ও হেদায়াতের ঐশী নূর প্রত্যক্ষ করছি।’ তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তি হচ্ছে দারুল উলূম হাটহাজারী মাদরাসা। তিনি ছিলেন এই মাদরাসার স্বপ্নসাধক ও প্রথম উদ্যোক্তা।
আধ্যাত্মিকতা
মাওলানা আবদুল ওয়াহিদ বাঙ্গালি রহ. ইলমে যাহেরির পাশাপাশি ইলমে বাতেনির ক্ষেত্রেও শাহসওয়ার ছিলেন। তিনি ছিলেন হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি রহ. ও মাওলানা ফযলুর রহমান গঞ্জেমুরাদাবাদির বিশিষ্ট খলিফা, কিন্তু তিনি নিজেকে অনেক গোপন করে রাখতেন। কথাবার্তায় তো দূরের কথা, ইশারা-ইঙ্গিতেও পির-মুরিদির কোনো বিষয় প্রকাশ করতেন না; বরং এমনভাবে চলাফেরা করতেন যে-তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। তবে যেমনিভাবে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, বিতর্কসভায় যোগদান এবং ওয়ায-মাহফিলের মাধ্যমে তিনি যাহেরি ইলমের ঝরণা প্রবাহিত রেখে মূল বুনিয়াদি ও বাহ্যিক আমল চালু রেখেছিলেন, তেমনি আধ্যাত্মিকতার ঝরণাও সমানভাবে প্রবাহিত হোক-এটা মনেপ্রাণে কামনা করতেন। আর এ জন্য তিনি শায়খুল মাশায়েখ মাওলানা শাহ যমিরুদ্দিন সাহেবকে কাজে লাগানোর ইচ্ছা করেন।
মাওলানা শাহ যমিরুদ্দিন রহ. তাঁর কথা রাখলে মাওলানা আবদুল ওয়াহিদ রহ. তাঁর কাছে বায়আত হয়ে গেলেন। আর এভাবেই দারুল উলূম হাটহাজারী থেকে ইলমে বাতেনির ফোয়ারা বিশ্বময় প্রবাহিত হয়েছে।
ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার
দারুল উলুম দেওবন্দে বহুদিন পড়াশোনার পর পর ছেলে মায়ের কোলে ফিরে এসেছে, মা ছেলেকে কাছে পেয়ে আনন্দের সাগরে ভাসতে লাগলেন। তবে দেশে ফিরার পর মায়ের মনে সন্দেহ জাগলো যে, আবার কখন কোল খালি করে বিদেশে পাড়ি জমায়। এ আশংকায় মা একটি পন্থাবলম্বন করলেন। যাতে ছেলে দেশ ত্যাগ না করতে পারে, সেজন্য মা রাউজান থানার কদলপুর গ্রামের উপযুক্ত এক পাত্রীর সন্ধান করে ছেলেকে বিবাহ করান।
তাঁর স্ত্রী উচ্চ বংশ ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে হয়েও দ্বীনদারির প্রতি একটু গাফেল হওয়ায় স্ত্রীকে অনেক ওয়ায-নছিহত ও ভয়-ভীতি দেখালেন। অনেক প্রচেষ্টার পরেও যখন তার গাফলতি ও উদাসীনতা দূর হলো না, তখন তিনি স্ত্রীর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার মনস্থ করলেন এবং পৈত্রিক একটি সম্পত্তি বিক্রি করে স্ত্রীর মোহর আদায় করে স্ত্রীকে নিরুপায় হয়ে তালাক প্রদান করেন। এবং পুত্র সোলাইমান এর সাথে দ্বীনের খাতিরে সম্পর্ক ত্যাগ করার বর্ণনাও পাওয়া যায়।
কিছুদিন পর মাওলানা সূফি আযিযুর রহমান ছাহেবের প্রচেষ্টায় একজন বিধবা মহিলাকে বিবাহ করেন এবং বাবুনগরের ধুরং খালের পশ্চিম পাশ্বে অস্থায়ীভাবে গৃহ নির্মাণ করে স্বপরিবারে বসবাস করতে থাকেন। পরে যখন হাটহাজারী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়, তখন তিনি ইলমে কেরাত ও তাজবিদের শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন এবং হাটহাজারী মাদরাসার পশ্চিম পাশে মাইল্যার বাড়িতে স্বপরিবারে অবস্থান করেন।
মৃত্যু
বাংলাদেশে দারুল উলূম দেওবন্দকেন্দ্রিক ইসলামি শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের প্রধান মুরব্বি ও আহবায়ক, আশেকে কুরআন ও যুগের শ্রেষ্ঠ সংস্কারক মাওলানা আব্দুল ওয়াহেদ রহ. আল্লাহ তা’আলার অমোঘ নীতি অনুসারে নিজ গ্রামে ১৩২৩ হিজরি মুতাবিক ১৯০৫ ঈসাব্দে হাজারো ভক্ত-অনুরক্তদেরকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে পরপারে পাড়ি জমান। শায়খুল ইসলাম মাওলানা হাবিবুল্লাহ কুরাইশি রহ. তাঁর জানাযার নামাযের ইমামতি করেন এবং হাওলা খরন্দ্বীপ গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
প্রতিষ্ঠান
- পড়েছেন: মুহসিনিয়া মাদরাসা
- পড়েছেন: দারুল উলুম দেওবন্দ
- দায়িত্ব পালন করেছেন: জামিয়া ইসলামিয়া মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী
তথ্যসূত্র
- মাশায়েখে চাটগাম, মাওলানা আহমদ হাসান, পৃ. ২৯-৬৭, প্রথম খণ্ড, আহমদ প্রকাশন, জামি’আ রোড, পটিয়া, চট্রগ্রাম
- দারুল উলূম হাটহাজারীর ইতিহাস, মুফতি জসিমুদ্দিন, পৃ. ১৮০-১৮৫, বুখারি একাডেমি, মাদরাসা মার্কেট হাটহাজারী চট্রগ্রাম, প্রথম প্রকাশ-২০০২ খ্রি.
শেষ হালনাগাদ: ১ নভেম্বর, ২০২৬