হাফেজ্জী হুজুর

মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. ১৮৯৫ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার নোয়াখালী জেলার রায়পুর থানার লুধুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ইদ্রিস এবং মাতার নাম খাদিজা। পারিবারিক সূত্রে তিনি এমন এক ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে ইসলামী শিক্ষা ও আমলের চর্চা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাদা…

জন্ম ও বংশ

মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. ১৮৯৫ সালে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার নোয়াখালী জেলার রায়পুর থানার লুধুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ইদ্রিস এবং মাতার নাম খাদিজা। পারিবারিক সূত্রে তিনি এমন এক ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে ইসলামী শিক্ষা ও আমলের চর্চা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর দাদা আকরামুদ্দিনের সঙ্গে উপমহাদেশের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সম্পর্কের কথা জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে কুরআন হিফজ, উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা এবং দ্বীনি খিদমতের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গনে স্বতন্ত্র পরিচিতি অর্জন করেন।

শৈশব

হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় পারিবারিক পরিবেশে। শৈশবে তিনি তাঁর চাচা মৌলভী মুহাম্মদ ইউনুসের কাছে কুরআন ও ফারসি ভাষার প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন। এরপর স্থানীয় বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন মাদরাসায় ইসলামী জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পান। ছোটবেলা থেকেই দ্বীনি শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। পরবর্তী সময়ে কুরআনুল কারিম হিফজ করার উদ্দেশ্যে তিনি তৎকালীন ভারতের পানিপথে যান। তাঁর এই শিক্ষাসফর ছিল দীর্ঘ সাধনা ও অধ্যবসায়ের সূচনা, যা তাঁকে পরবর্তী জীবনে একজন বিশিষ্ট আলেম ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে।

শিক্ষা-দীক্ষা

হাফেজ্জী হুজুর রহ. শৈশবেই কুরআন ও ফারসি ভাষার প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কুরআনুল কারিম হিফজের জন্য ভারতের পানিপথে যান। এরপর উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষা অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন তাঁকে কুরআন, হাদিস ও ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় সুদক্ষ করে তোলে। পরবর্তী জীবনে তিনি শিক্ষাদান, দ্বীনি দাওয়াত এবং আত্মশুদ্ধির মেহনতের মাধ্যমে নিজের অর্জিত জ্ঞান মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। তাঁর ইলমি ও আধ্যাত্মিক জীবন বাংলাদেশের ধর্মীয় ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

কর্মজীবন

শিক্ষাজীবন শেষ করে হাফেজ্জী হুজুর রহ. শিক্ষকতা ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. ও মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব পীরজি হুজুর রহ.-এর সঙ্গে তিনি দেশের বিভিন্ন স্থানে দেওবন্দের শিক্ষাধারা অনুসরণে ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজে যুক্ত হন। বড়কাটারা, ফরিদাবাদ ও লালবাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাদরাসার বিকাশে তাঁর ভূমিকার কথা জীবনীমূলক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। ১৯৬৫ সালে ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে তাঁর উদ্যোগে জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। কুরআন শিক্ষার প্রসার ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহের বিষয়। তিনি মক্তব প্রতিষ্ঠা ও হিফজ শিক্ষার বিস্তারকে গুরুত্ব দিতেন এবং এ উদ্দেশ্যে আলেম ও শিক্ষকদের উৎসাহিত করতেন। শিক্ষকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের পাশাপাশি তিনি আধ্যাত্মিক সংশোধন, তাওবা এবং ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানান। পরবর্তী সময়ে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে জনজীবন ও রাজনীতিতে অংশগ্রহণও যুক্ত হয়।

অবদান

হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর অবদান বাংলাদেশের ধর্মীয় জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিস্তৃত। ইসলামী শিক্ষার প্রসার, মাদরাসাকেন্দ্রিক দ্বীনি খিদমত এবং কুরআন শিক্ষার প্রতি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার কাজে তিনি দীর্ঘকাল নিয়োজিত ছিলেন। শিক্ষকতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার পাশাপাশি তিনি আত্মশুদ্ধি, তাওবা এবং আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ক সংশোধনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর কাছে দ্বীনের দাওয়াত কেবল আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্যক্তিগত জীবন, নৈতিক আচরণ ও সামাজিক দায়িত্ববোধেও ইসলামের শিক্ষা বাস্তবায়নের আহ্বান ছিল এর অংশ। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮১ ও ১৯৮৬ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় নিয়ে আসে। তাঁর ধর্মীয় ও জনজীবনসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সমকালীন ইসলামী ইতিহাসের আলোচনায় উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে।

আধ্যাত্মিকতা

হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর আধ্যাত্মিক জীবনের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল আত্মশুদ্ধি, তাওবা এবং আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ককে সংশোধন করা। তিনি মাওলানা শাহ আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর সান্নিধ্য লাভ করেন এবং তাঁর কাছ থেকে আধ্যাত্মিক দীক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর দাওয়াতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষকে গুনাহ থেকে ফিরে আসতে, নিজের ভুল স্বীকার করতে এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহভীতি ও নৈতিকতার চর্চা করতে উদ্বুদ্ধ করা। তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষা ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্যক্তি ও সমাজের আচরণেও তার প্রতিফলন ঘটুক, এমন আহ্বান তিনি জানাতেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর ‘তাওবার রাজনীতি’ ধারণাতেও এই চিন্তার প্রকাশ দেখা যায়।

ব্যক্তিচরিত্র ও আখলাক

হাফেজ্জী হুজুর রহ.-এর ব্যক্তিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিক সংশোধনের ওপর তাঁর জোর। তিনি মানুষকে তাওবা, আত্মসমালোচনা এবং অসৎ কাজ পরিহারের আহ্বান জানাতেন। তাঁর দৃষ্টিতে ধর্মীয় জীবনের দাবি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতে পূর্ণ হয় না; সততা, দায়িত্ববোধ ও আচরণের শুদ্ধতাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। জনজীবনে তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে আলেম, আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক ও তাওবার দাওয়াতদাতা হিসেবে। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যেও ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক জীবনে নৈতিকতার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পেয়েছিল। তাঁর চরিত্র ও কর্মের মূল্যায়নে সমকালীন সাক্ষ্য, জীবনীগ্রন্থ এবং নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বিবরণ বিবেচনা করা প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার

মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার লুধুয়া গ্রামের এক ধর্মপরায়ণ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ইদ্রিস এবং মাতার নাম খাদিজা। তাঁর পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি দ্বীনি শিক্ষা, শিক্ষকতা ও আধ্যাত্মিক সাধনাই ছিল তাঁর দীর্ঘ জীবনের প্রধান পরিচয়। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মাওলানা শাহ আহমাদুল্লাহ আশরাফও ধর্মীয় অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৮৭ সালের ৭ মে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন এবং তাঁকে ঢাকায় জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়ার সংলগ্ন কবরস্থানে দাফন করা হয়।

মৃত্যু

মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. ১৯৮৭ সালের ৭ মে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালে বাংলাদেশের ধর্মীয় অঙ্গনে একজন প্রবীণ আলেম ও আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শকের বিদায় ঘটে। দীর্ঘ জীবনে তিনি ইসলামী শিক্ষা, তাওবার দাওয়াত এবং আত্মশুদ্ধির চর্চায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তাঁর জানাজায় বহু মানুষের অংশগ্রহণ তাঁর প্রতি জনসাধারণের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পরিচায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষা ও দ্বীনি কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের ইসলামী ইতিহাসের আলোচনায় স্মরণীয় হয়ে আছে।

প্রতিষ্ঠান

তথ্যসূত্র

  1. আখতার ফারূক, অধ্যাপক, মধ্যপ্রাচ্যে হাফেজ্জী হুজুর, হিজবুল্লাহ প্রকাশনী, ঢাকা, ১৯৮৩।
  2. মুজিবুর রহমান, সম্পাদিত, আমীরে শরীয়ত হযরত মাওলানা মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) জীবন ও দর্শন, বিশ্বকল্যাণ পাবলিকেশন্স, ২০০৮।
  3. আবরার আবদুল্লাহ, “হাফেজ্জী হুজুর (রহ.)-এর জীবন-সংগ্রাম”, কালের কণ্ঠ, ৭ মে ২০২২।

শেষ হালনাগাদ: ১ নভেম্বর, ২০২৬

একই শতাব্দীর আলেম