বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত শিবচর থানার শামাইল নামক গ্রামে আবদুল জলীল তালুকদার নামে এক সম্মানিত প্রতাপশালী ব্যক্তি বাস করতেন। তিনি ছিলেন একজন সৎ, সাধু ও অমায়িক ব্যক্তি। সাধারণ অত্যাচারী জমিদার তালুকদারদের মতো তিনি প্রজাদের উপর জুলুম-অত্যাচার করতেন না। তার সদ্ব্যবহারে প্রজারা ছিল তার প্রতি ভক্তিপরায়ণ। তার সদাচরণ ও সদ্ব্যবহারে সকলে তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল এবং তাকে সকলে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখত।
এই মহৎপ্রাণ আবদুল জলীল তালুকদারের ঘরেই ১৭৮১ সালে জন্মগ্রহণ করেন উপমহাদেশের খ্যাতিমান সংগ্রামী মুজাহিদ হাজি শরীয়তুল্লাহ রহমাতুল্লাহি আলায়হি। আবদুল জলীল তালুকদার পুত্র শরীয়তুল্লাহ এবং এক কন্যা সন্তান রেখে এ দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। মুহাম্মদ আজীম এবং মুহাম্মদ আশিক নামক আবদুল জলীলের দুই ভাই ছিলেন। মুহাম্মদ আজীম সাংসারিক কাজ-কর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ছোটভাই মুহাম্মদ আশিক ছিলেন একজন অভিজ্ঞ আলেম। তিনি মুর্শিদাবাদের প্রসিদ্ধ নবাব বাহাদুরের দরবারে মুফতি ছিলেন এবং সপরিবারে মুর্শিদাবাদেই অবস্থান করতেন।
আবদুল জলীল তালুকদারের ইনতেকালের পর পুত্র শরীয়তুল্লাহ এবং কন্যা তার ভাই মুহাম্মদ আজীম তালুকদারের তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন। মুহাম্মদ আজীমের কোনো সন্তান ছিল না। এতিম সন্তান দুটিকে তিনি এবং তার স্ত্রী অতি আদর-যত্ন সহকারেই লালন-পালন করতেন।
মাওলানা
হাজী শরীয়তুল্লাহ
হাজী শরীয়তুল্লাহ (১৭৮১-১৮৪০) ধর্মীয় সংস্কারক, নীলকর ও সামন্তবাদ বিরোধী নেতা এবং ভারতবর্ষে সংঘটিত ফরায়েজি আন্দোলনের মুখপাত্র। তিনি শুধু ধর্মীয় সংস্কারক ছিলেন না, বরং কৃষক, তাঁতি এং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করার জন্য সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন। অনেকের মতে, তিনি ওয়াহাবি আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ইসলামের প্রধান করণীয় কাজকে বলে 'ফরজ'। এচিন্তা থেকেই তার সংস্কার আন্দোলনের নাম হয় 'ফরায়েজি আন্দোলন'।
জন্ম ও বংশ
শৈশব
বালক শরীয়তুল্লাহ বাড়িতে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করার পর চাচা-চাচির নিকট থেকে লেখাপড়ার উদ্দেশে কলকাতা চলে যান এবং সেখানকার তৎকালীন বুজুর্গ আলেম মাওলানা বশারত আলীর স্নেহ-যত্নে থেকে ইসলামি শিক্ষালাভে মনোনিবেশ করেন। মাওলানা বশারত আলী শরীয়তুল্লাহর লেখাপড়ার প্রতি গভীর মনোযোগ ও তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লক্ষ করে নিজেই তার পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করতেন। শরীয়তুল্লাহ লেখাপড়ার ফাঁকে মাঝে মাঝে কলকাতা থেকে চাচা মুফতি মুহাম্মদ আশিকের সঙ্গে সাক্ষাত করার জন্যে মুর্শিদাবাদে যেতেন। একবার মুফতি আশিক ও তার পত্নীর সঙ্গে নৌকাযোগে ফরিদপুরস্থ নিজ বাড়িতে যাবার সময়ই পূর্বোল্লিখিত নৌ-দুর্ঘটনা ঘটে, যাতে গঙ্গাবক্ষে মুফতি আশিক ও তার পত্নীর সলিল সমাধি ঘটে।
এ দুর্ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাবার পর বালক শরীয়তুল্লাহ মনের দুঃখে আর স্বদেশে না গিয়ে পুনরায় কলকাতা চলে যান এবং আপন উস্তাদের কাছে সকল দুঃখের কাহিনি খুলে বলেন। উস্তাদ পুনরায় তাকে আশ্রয় দেন এবং ধৈর্য ও মনোযোগ সহকারে লেখাপড়া করার নির্দেশ দেন।
শিক্ষা-দীক্ষা
কিছুদিন পর বালক শরীয়তুল্লাহ উস্তাদ মাওলানা বশারত আলীর সঙ্গে মক্কা শরিফ গমন করেন। উল্লেখ্য যে, মাওলানা বশারত আলী নানা কারণে মক্কায় হিজরত করার মনস্থ করেছিলেন। তিনি মক্কায় ২০ বছর অবস্থান করেন এবং এ দীর্ঘ সময় তরুণ শরীয়তুল্লাহ বিভিন্ন আলেমের কাছে ধর্মীয় উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। তিনি একজন সুদক্ষ আলেম হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন এবং সেখানেই দীনি শিক্ষাদানের কাজে ব্রতী হন। তখন ‘ছোট আবু হানিফা’ নামে খ্যাত মক্কায় মাওলানা তাহের চোম্বল নামক এক প্রসিদ্ধ বুজুর্গ থাকতেন। মাওলানা শরীয়তুল্লাহ উক্ত মুর্শিদে কামেল মাওলানা তাহের চোম্বলের নিকট বায়আত হন।
আধ্যাত্মিকতা
মাওলানা শরীয়তুল্লাহ আপন মুর্শিদ তাহের চোম্বলের দরবারে আত্মশুদ্ধির অনুশীলনে উচ্চতর যোগ্যতা লাভের পর স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তখন তার চাচা মুহাম্মদ আজীম তালুকদার জীবন সায়াহ্নে উপনীত।
মানুষের ধর্মবিমুখতা, অপসংস্কৃতি চর্চা এবং ধর্মের প্রতি অনাগ্রহ ও বিভিন্ন কুসংস্কার লক্ষ করে মাওলানা হাজি শরীয়তুল্লাহ অন্তরে অত্যন্ত ব্যথা অনুভব করলেন। তিনি মানুষকে দীনের পথে আনার জন্যে বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করলেন। তিনি পুনরায় পবিত্র মক্কা-মদিনা সফরের মনস্থ করেন এবং তিনি পদব্রজে যাত্রা শুরু করেন।
যাত্রাপথে প্রথমে বাগদাদে গিয়ে ইসলামের জন্যে নিবেদিতপ্রাণ বীরপুরুষদের পবিত্র স্মৃতিসমূহ জিয়ারত করেন। তিনি দীনের জন্য আত্মত্যাগের চরম দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ইমাম হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর স্মৃতিবিজড়িত কারবালা ময়দানে ইমামের শাহাদাতগাহ, তার মাজার এবং হজরত আবদুল কাদির জিলানি রহমাতুল্লাহি আলায়হির মাজার জিয়ারত করেন। বায়তুল মুকাদ্দাস ও মিসর ইত্যাদি স্থান সফর করে সেসব স্থানের বরকত হাসিল করেন।
হজব্রত পালনের পর আপন মুর্শিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তার থেকে দোয়া নিয়ে পবিত্র মদিনায় উপস্থিত হন। হাজি শরীয়তুল্লাহ দুই বছর মদিনায় অবস্থানকালে ইবাদত-রিয়াজত, মুশাহাদায় রত থাকেন। কথিত আছে যে, একবার তিনি উপর্যুপরি তিনবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখেন। পবিত্র মক্কা শরিফে এসে তার মুর্শিদের নিকট স্বপ্নের বিবরণ খুলে বলেন। তাতে মুর্শিদ অত্যন্ত সন্তুষ্ট হয়ে তাকে খেলাফত প্রদান করেন ও স্বদেশে গিয়ে নির্ভীকভাবে ইসলামের প্রচারকাজে লিপ্ত হবার নির্দেশ দেন।
কর্মজীবন
মুর্শিদের নির্দেশনা পাওয়ার পর মাওলানা হাজি শরীয়তুল্লাহ ১৮২৭ ঈসায়িতে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে নতুন করে ইসলামের দাওয়াতি কাজ শুরু করেন। এবার তার ইসলামি দাওয়াতি কাজে বিরাট সাড়া পড়ে যায়। তিনি যাবতীয় কুসংস্কারবর্জিত নির্ভেজাল পন্থায় ইসলামের মূল প্রাণসত্তাকে মানুষের সামনে তুলে ধরেন। তার ইসলামি দাওয়াতের কাজ ‘ফরায়েজি আন্দোলন’রূপে প্রসিদ্ধি লাভ করে। আসাম ও তৎকালীন সারা বাংলায় তার এ আন্দোলন বিরাট সাড়া জাগায়। মুসলমানরা দলে দলে তার ফরায়েজি আন্দোলনে যোগ দিয়ে শিরক-বিদআত বর্জন করতে থাকে। যে সকল বিষয় ইসলামের মূল প্রাণসত্তাকে দুর্বল করে রেখেছিল, সে সকল আবিলতামুক্ত হওয়ায় বাংলা-আসামে মুসলমানদের মধ্যে ইসলাম এক বিপ্লবী চেতনা লাভ করে। এতে স্বভাবতই ইসলামের প্রাধান্য এবং শ্রেষ্ঠত্বের পথে পরাধীনতার যে মস্তবড় প্রাচীর দণ্ডায়মান রয়েছে, তার প্রতি জনগণের দৃষ্টি পড়ে। মুসলিম জনগণ স্পষ্ট বুঝতে পারে যে, ইংরেজ প্রভু এবং তাদের দোসরদের আধিপত্য ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি মস্তবড় চ্যালেঞ্জ। ফরায়েজি আন্দোলনের এটাই বড় সফলতা যে, এ আন্দোলন এদেশের ঝিমিয়ে পড়া মুসলমানদের ইসলামি চেতনাকে প্রজ্বলিত করেছিল এবং আল্লাহ ছাড়া অপর যে কোনো শক্তিকে হেয় জ্ঞান করার শিক্ষা দিয়েছিল। তার ফল দাঁড়াল এই যে, মুসলমানদের উপর ইংরেজ সরকার এবং তাদের বশংবদ হিন্দু জমিদার-তালুকদাররা যেসব জুলুম চালিয়ে যাচ্ছিল, সেই জুলুম-নিপীড়নের বিরুদ্ধে তারা রুখে দাঁড়াল।
হাজি শরীয়তুল্লাহ ১৮২৪ ঈসায়িতে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরই তার সংস্কার আন্দোলনের কাজের সূচনা করেন। তিনি দিল্লিতে শাহ আবদুল আজিজ দেহলভি কর্তৃক তার কিছুকাল পূর্বে ঘোষিত ফতোয়ারই প্রতিধ্বনি করে ঘোষণা করলেন যে, বিদেশি ফিরিঙ্গি সরকারের শাসনাধীন থাকায় এদেশ ‘দারুল হরব’ তথা বিধর্মীশাসিত দেশ।
অবদান
প্রতিবেশী হিন্দু সমাজের সঙ্গে দীর্ঘদিন সহাবস্থানের ফলে এবং নিজেদের মধ্যে যথার্থ ধর্মীয় বোধ না থাকায় মুসলিম সমাজে অনেক হিন্দুয়ানী রীতিনীতি ও ধ্যান-ধারণা অনুপ্রবেশ করেছিল, যা ছিল ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের সম্পূর্ণ খেলাফ। শিরক-বিদআত, পীর-ফকিরের মাজারে সেজদা, মানত ও শিরনি দেয়া, মহরম মাসে তাজিয়া বের করা, হিন্দুদের পূজা-পার্বণের উৎসবে গান-বাজনায় যোগদান প্রভৃতি কাজকে তিনি ইসলামের প্রাণসত্তা বিরোধী বলে ঘোষণা করেন। তিনি সকল মুসলমানকে এসব কাজ থেকে বিরত থাকার উপদেশ দেন। তিনিই এ দেশে সর্বপ্রথম শরীয়ত-তরিকতের পথপ্রদর্শক পীরদের মর্যাদা সম্পর্কে ঘোষণা করলেন যে, তারা উস্তাদ বা শিক্ষকের চাইতে বেশি কিছু নন। অথচ এখানে এ ধারণা বিরাজমান ছিল যে, পীরেরা মুরিদানকে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে বেহেশতে নিয়ে যাবে। ফলে অনেক মুরিদ পাপাচারে লিপ্ত থাকত এবং যথাযথভাবে আমল করত না। কারণ তাদের ধারণা যে, আমলে আখলাকে কিছুটা কমতি থাকলেও পীর কেবলা সেটা সারিয়ে নেবেন। বিবাহ এবং অন্যান্য সামাজিক উৎসবে অযথা অপব্যয় করার তিনি বিরোধিতা করতেন।
মুসলমান সমাজে আর্থিক উন্নয়নের ব্যাপারে হাজি শরীয়তুল্লাহ বিশেষ সচেষ্ট ছিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করবে না এবং আল্লাহর নির্দেশিত ফরজ কর্তব্য সম্পাদনেই তাদের অধিক মনোযোগী হতে হবে। প্রথমে ফরজ কর্তব্যসমূহের প্রতিই অধিক গুরুত্বারোপের কারণে তার সংস্কার আন্দোলন ফরায়েজি আন্দোলন নামে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠে। ফরায়েজি আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী হাজার হাজার মুসলমান যেন এমন একটি সংগঠনেরই প্রতীক্ষায় ছিল, যা তাদের নেতৃত্ব দেবে।
এভাবেই বঞ্চিত শোষিত মজলুম মুসলমান যারা দেশের নতুন শাসক ও তাদের মদদপুষ্ট নতুন গজানো জমিদারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল, তারা ফরায়েজি আন্দোলন-কেন্দ্রিক এক উল্লেখযোগ্য শক্তি হয়ে আত্মপ্রকাশ করল। জনগণের মধ্যে এ আন্দোলনের প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং হাজি শরীয়তুল্লাহর সংস্কার প্রচেষ্টা এক অভাবনীয় সাফল্যের সৃষ্টি করে।
মৃত্যু
হাজি শরীয়তুল্লাহ ১৮৪৩ ঈসায়ির ১৬ জানুয়ারি লাখো অনুসারীকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে ইহকাল ত্যাগ করেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও পরিবার
হাজি শরীয়তুল্লাহর ইন্তেকালের পর তার সুযোগ্য পুত্র মুহসিনউদ্দীন আহমদ দুদু মিঞা পিতার অসমাপ্ত কাজ সমাধাকল্পে ফরায়েজি আন্দোলনের নেতৃত্ব পদে সমাসীন হন।
তথ্যসূত্র
- • হাজী শরীয়তুল্লাহ • লেখক: মোশাররফ হোসেন খান • প্রকাশনী: প্রচ্ছদ প্রকাশন / বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার • পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৮০ পৃষ্ঠা
শেষ হালনাগাদ: ১ নভেম্বর, ২০২৬